সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স এর প্রতারণা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সতর্কতা
২০২৬ সালে এসেও সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স এর প্রতারনার ঘটনা পুরোপুরি থামেনি। সম্প্রতি রাজশাহীর এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তার ২০ বছরের পুরনো পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পর টাকা তুলতে গিয়ে দেখেন, কোম্পানির শাখা অফিস বন্ধ। যোগাযোগ করা গেলেও উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। এই ঘটনা শুধু একটি নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার গ্রাহক একই সমস্যায় পড়েছেন। বীমা নেওয়ার সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল ম্যাচিউরিটি বেনিফিট, বোনাস আর লোন সুবিধার। কিন্তু যখন গ্রাহকের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই সময়ে দেখা দেয় বিশাল জটিলতা। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অনেকেই তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় হারানোর ভয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।তবে শুধু গল্প শুনলে হবে না। আপনাকে জানতে হবে কিভাবে এই প্রতারণা সংগঠিত হচ্ছে, কোন কোন ফাঁদে পড়ছেন গ্রাহকরা এবং করণীয় কী। নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি: একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও বর্তমান অবস্থা
সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড একটি সরকারি মালিকানাধীন বীমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত ছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালের দিকে কোম্পানিটির আর্থিক অনিয়ম ও কর্তৃত্বপূর্ণ শৃঙ্খলার অভাব প্রকট আকার ধারণ করে। ২০২৬ সাল নাগাদ দেখা গেছে, কোম্পানির অনেক শাখাই কার্যত বন্ধ বা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। কিছু শাখা শুধু নামে আছে, সেখানে কোনো কর্মকর্তা নেই। ফলে গ্রাহকরা তাদের পলিসি সম্পর্কিত কোনো তথ্য পাচ্ছেন না, প্রিমিয়াম জমা দিলেও রশিদ দিচ্ছে না, এবং ম্যাচিউর হয়ে যাওয়া পলিসির টাকা উত্তোলনে বিরাট বেগ পেতে হচ্ছে।
একটি বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে ২৫০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই টাকা ফেরত না পাওয়া এবং প্রিমিয়াম গায়েব হওয়ার অভিযোগ।
কীভাবে সংঘটিত হচ্ছে সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স এর প্রতারণা?
প্রতারণার ধরনগুলো বোঝা গেলে আপনি সহজে ফন্দি এড়াতে পারবেন। নিচে কয়েকটি প্রধান পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো।
১. ম্যাচিউরিটি বেনিফিট না দেওয়া
গ্রাহকরা ১০, ১৫ বা ২০ বছর ধরে নিয়মিত প্রিমিয়াম দিয়ে আসছেন। পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পর কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়ার কথা একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ম্যাচিউরিটির পর কোম্পানির শাখায় যোগাযোগ করলে কর্মকর্তারা নানা অজুহাত দেখান। কখনো বলেন, “সিস্টেম আপডেট হচ্ছে”, কখনো বলেন, “আপনার কাগজপত্র অসম্পূর্ণ”, আবার কখনো চুপ করে থাকেন। অনেক গ্রাহক মাসের পর মাস টাকা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
উদাহরণ: ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা মো. হাসান আলী ২০০৫ সালে একটি ১৫ বছরের পলিসি করেন। ২০২০ সালে পলিসি ম্যাচিউর হয়। কিন্তু ২০২৬ সালেও তিনি টাকা পাননি। কোম্পানির হেড অফিসে গেলে বলা হয়, শাখা থেকেই টাকা দেওয়ার কথা। শাখায় গেলে বলে হেড অফিসের অনুমতি লাগবে—এই পিংপং খেলা চলছে এখনও।
২. প্রিমিয়াম জমা নেওয়ার পর রশিদ ও রেকর্ড না রাখা
গ্রাহকরা যদি ক্যাশ বা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রিমিয়াম জমা দেন, তাহলে অনেকে সময়মতো রশিদ পান না। কোম্পানির এজেন্টরাও প্রিমিয়াম জমা না দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে নিয়ে গায়েব হয়ে যান। পরে যখন গ্রাহক কোম্পানিতে যোগাযোগ করেন, তখন দেখা যায় তাদের প্রিমিয়ামের কোনো রেকর্ডই নেই। ফলে পুরো পলিসি ডিফল্ট হয়ে যায় বা ল্যাপস হয়ে যায়।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার বয়স্ক ও কম শিক্ষিত গ্রাহকরা এই ফাঁদে পড়ছেন বেশি। তাদের কাছে কাগজপত্রের গুরুত্ব বোঝানো হয় না, শুধু বলে “আপনার টাকা সেভ হচ্ছে”। আসলে টাকা সেভ হচ্ছে না, বরং চুরি হচ্ছে।
৩. জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক পলিসি বুকিং
অনেক এজেন্ট গ্রাহকের নামে জালিয়াতি করে পলিসি বুক করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্রাহকের অজান্তেই তার নামে নতুন পলিসি খুলে প্রিমিয়াম জমা নেওয়া হয়েছে। আবার কখনও গ্রাহকের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়ার পর পলিসির শর্ত পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের ঘটনায় গ্রাহকের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে না।
৪. লোন ও সারেন্ডার ভ্যালুতে অনিয়ম
গ্রাহকের জরুরি টাকা দরকার হলে তারা পলিসির বিপরীতে লোন নিতে চান। কিন্তু সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সে লোন নিতে গেলে অফিস থেকে বলা হয় “এই পলিসিতে লোন সুবিধা নেই” অথবা “আপনার পলিসি এখনও ৩ বছর হয়নি”—অথচ সেই পলিসির বয়স ১০ বছর। অথবা সারেন্ডার করলে যে টাকা পাওয়ার কথা, তা থেকে ৫০-৭০ শতাংশ কম দেওয়া হয়। এমনকি সারেন্ডার করার পরও টাকা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রিতা করা হয়।
গ্রাহকের করণীয় ও সতর্কতা
আপনি যদি সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের গ্রাহক হন বা হতে চান, তাহলে নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখুন।
কাগজপত্র ও রশিদ সংরক্ষণ
প্রত্যেকটি প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার পর অফিসিয়াল রশিদ নিন। যদি অনলাইনে জমা দেন, তাহলে ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রিন্ট আউট নিয়ে রাখুন। এজেন্টকে বিশ্বাস করে শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি নেবেন না। সব কাগজপত্রের ফটোকপি, পলিসি ডকুমেন্ট এবং পরিচয়পত্রের কপি নিরাপদ জায়গায় রাখুন। মনে রাখবেন, প্রতারণার সময়ই এই কাগজপত্র আপনার একমাত্র অস্ত্র।
নিজে কোম্পানির সাথে সরাসরি যোগাযোগ
যদি এজেন্টের মাধ্যমে কোনো সুবিধা না পান, তাহলে সরাসরি কোম্পানির হেড অফিসে চিঠি বা ইমেইল করুন। সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের হেড অফিস ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকায় অবস্থিত। তাদের হটলাইন নম্বর ও ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে অভিযোগ জানান। কিন্তু বোঝাপড়া করুন ধৈর্য ধরে, কারণ কোম্পানির বর্তমান অবস্থা ভালো না।
আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ
যদি কোম্পানি টাকা দিতে অস্বীকার করে বা অযথা দেরি করে, তাহলে আপনি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA)-তে অভিযোগ করতে পারেন। IDRA বর্তমানে বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। এছাড়াও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর-এ মামলা করতে পারেন। এক্ষেত্রে সব কাগজপত্র ও প্রমাণাদি জমা দিতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে আদালতেও যেতে পারেন।
নতুন বীমা নেওয়ার আগে সতর্ক থাকুন
আপনি যদি নতুন বীমা কিনতে চান, তাহলে সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের পরিবর্তে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য বেসরকারি বীমা কোম্পানি বেছে নিন। বর্তমানে বাজারে বেশ কিছু ভালো বীমা প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ক্লেম সেটেলমেন্ট রেশিও ও গ্রাহক সেবায় এগিয়ে। তবে যেকোনো কোম্পানি বাছাইয়ের আগে তাদের ট্র্যাক রেকর্ড, রেটিং এবং অনলাইন রিভিউ দেখে নিন।
সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স প্রতারণায় বাস্তব ঘটনার উদাহরণ
| ঘটনার স্থান | গ্রাহকের নাম | প্রতারনার ধরন | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|---|
| খুলনা | মো. রফিকুল ইসলাম | ম্যাচিউরিটি টাকা না দেওয়া | আদালতে মামলা চলছে |
| চট্টগ্রাম | শাহীন আকতার | প্রিমিয়াম জমা নেওয়ার পর রশিদ না দেওয়া | IDRA-তে অভিযোগ করায় তদন্ত চলছে |
| রাজশাহী | আবদুল আলীম | জাল পলিসি বুকিং | পুলিশ তদন্তে এজেন্ট গ্রেফতার |
| ঢাকা | সুফিয়া বেগম | লোন না দেওয়া | ভোক্তা অধিদপ্তর থেকে সমঝোতার চেষ্টা |
উপরের টেবিল থেকে বোঝা যায়, প্রতারণা শুধু কোনো একটি এলাকায় নয়, সারা দেশেই ছড়িয়ে আছে। প্রতিটি ঘটনাই প্রায় একই ধরনের, যেখানে গ্রাহক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
প্রতারণা এড়াতে করণীয়: বিস্তারিত গাইডলাইন
পলিসি কেনার সময় কী কী খেয়াল করবেন?
প্রথমে b>পলিসি ডকুমেন্ট ভালোভাবে পড়ুন। শর্তাবলী, ম্যাচিউরিটি পরিমাণ, বোনাস, লোন নীতি এবং সারেন্ডার ভ্যালু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিন। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে কোম্পানির অফিসিয়াল প্রকৃত কর্মকর্তার সাথে কথা বলুন। এজেন্টের মুখের কথায় বিশ্বাস করবেন না। প্রতারক এজেন্টরা মোটা অংকের লাভ দেখিয়ে পলিসি করান, কিন্তু বাস্তবে তা দিতে পারে না।
প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার নিয়ম
প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার সর্বোত্তম উপায় হলো ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইন ট্রান্সফার বা চেক। এতে করে আপনার ট্রানজেকশনের রেকর্ড থাকবে। ক্যাশ দেওয়ার সময় অবশ্যই অফিসিয়াল রশিদ নিন। রশিদে কোম্পানির সিল, তারিখ ও স্বাক্ষর থাকা জরুরি। অন্যথায় রশিদ গ্রহণ করবেন না। যদি কোন এজেন্ট ক্যাশ নিয়ে রশিদ না দেয়, তাহলে সাথে সাথে তাকে ও কোম্পানিকে রিপোর্ট করুন।
যোগাযোগ ও অভিযোগ করার পদ্ধতি
প্রথমে কোম্পানির শাখায় যোগাযোগ করুন। যদি সেখান থেকে কোনো সাড়া না পান, তাহলে লিখিতভাবে হেড অফিসে অভিযোগ জানান। ইমেইল, ডাকযোগে বা সরাসরি গিয়েও দিতে পারেন। ৩০ দিনের মধ্যে কোনো ফল না পেলে IDRA-তে অভিযোগ করুন। IDRA-র ওয়েবসাইটে অনলাইনে অভিযোগ ফরম পূরণ করে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারেন।
সরকারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা
২০২৫ সাল থেকে IDRA সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। গত বছর IDRA কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে একজন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। তবে প্রশাসক নিয়োগের পরও গ্রাহক পর্যায়ে কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে IDRA প্রধান বলেন, “সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করাই আমাদের অগ্রাধিকার।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও পর্যন্ত অধিকাংশ গ্রাহকের টাকা আটকে আছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকও বীমা কোম্পানির সাথে লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে এর প্রভাব খুব একটা পড়েনি। তাই এখন গ্রাহককেই সচেতন হতে হবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।
সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স থেকে বেরিয়ে আসার উপায়
যদি আপনার পলিসি ম্যাচিউর হয়ে গেছে কিন্তু টাকা পাননি, তাহলে প্রথমে কোম্পানিকে চিঠি লিখুন। চিঠির কপি নিজের কাছে রাখুন। যদি ৬০ দিনের মধ্যে কোনো সাড়া না পান, তাহলে IDRA-তে অভিযোগ করুন। IDRA থেকে সাধারণত দ্রুত তদন্ত করে কোম্পানিকে টাকা দিতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু অনেক সময় আদালতের আশ্রয় নিতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে একজন ভালো আইনজীবী নিয়োগ করুন যিনি বীমা আইন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
আপনি যদি পলিসি চলমান অবস্থায় থাকেন এবং কোম্পানির অবস্থা দেখে আর প্রিমিয়াম দিতে চান না, তাহলে সারেন্ডার করার চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, সারেন্ডার করলে আপনি আপনার জমানো টাকার একটি অংশই ফিরে পাবেন। অনেক সময় কোম্পানি সারেন্ডার ভ্যালুও দিতে দেরি করে। তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ভবিষ্যৎ করণীয় ও সচেতনতার গুরুত্ব
প্রতারণা এড়ানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের বীমা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিন। তাদের বুঝিয়ে বলুন, কেবলমাত্র এজেন্টের কথায় পলিসি করা ঠিক নয়। প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার পর প্রতিবার রশিদ নেওয়া কতটা জরুরি। আর যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে লজ্জা বা ভয় না করে আইনগত সহায়তা নিন। অনেক গ্রাহক সামাজিক প্রতিপত্তির ভয়ে বা কাগজপত্রের ঝামেলায় মামলা করতে চান না। কিন্তু এই নীরবতাই প্রতারকদের উৎসাহিত করে।
বাংলাদেশের বীমা খাতে স্বচ্ছতা আনার জন্য IDRA ও সরকারের আরও কঠোর নীতির প্রয়োজন। গ্রাহক সুরক্ষায় একটি ডেডিকেটেড প্ল্যাটফর্ম থাকা উচিত যেখানে গ্রাহক সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারে। তবে যতক্ষণ না সেই ব্যবস্থা চালু হচ্ছে, ততক্ষণ আপনাকে নিজেকেই রক্ষা করতে হবে।
শেষ কথা
সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স এর প্রতারণা নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমে মনে হয়, যারা আক্রান্ত হয়েছেন তারা হতাশ হয়ে পড়বেন। কিন্তু আশা হারাবেন না। বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন প্লাটফর্ম, ভোক্তা অধিকার সংস্থা এবং আইন সহায়তা পাওয়া সহজ হয়েছে। আপনি একা নন, হাজার হাজার গ্রাহক একই সমস্যায় পড়েছেন। একসঙ্গে প্রতিকার চাওয়া গেলে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফেসবুক গ্রুপ, ফোরামে অভিযোগ শেয়ার করতে পারেন। অনেক সময় গণমাধ্যমের নজর পড়লে দ্রুত সমাধান হয়।
মনে রাখবেন, বীমা মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয় ও সুরক্ষার মাধ্যম। এর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। কিন্তু সেই আস্থা তৈরি করতে হলে কোম্পানিকে প্রথমে গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে হবে। যতক্ষণ না সেটি হচ্ছে, আপনি নিজের সন্তান ও পরিবারের সুরক্ষার জন্য বিকল্প বীমা কোম্পানি বেছে নিন এবং সব সময় সতর্ক থাকুন।
সর্বোপরি, সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স এর প্রতারনা থেকে বাঁচতে চাইলে কাগজপত্র যাচাই, নিয়মিত যোগাযোগ এবং আইনগত জ্ঞান অপরিহার্য। আশা করি এই নিবন্ধটি পড়ে আপনি আরও সচেতন হবেন এবং নিজের ও পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের ম্যাচিউরিটি টাকা পেতে কতদিন লাগে?
সাধারণত পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পর কোম্পানি থেকে ৩০-৪৫ দিনের মধ্যে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক গ্রাহক ৬ মাস থেকেও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। দ্রুত সমাধানের জন্য IDRA-তে অভিযোগ জানানো উত্তম।
আমার প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার রশিদ হারিয়ে গেছে, এখন কী করব?
আপনার ব্যাংকের স্টেটমেন্ট বা অনলাইন ট্রানজেকশনের প্রমাণ থাকলে সেটি দিয়ে কোম্পানিতে যোগাযোগ করুন। কোম্পানির প্রধান শাখায় গিয়ে পলিসি নম্বর উল্লেখ করে রেকর্ড দেখতে চান। যদি কোনো রেকর্ডই না থাকে, তাহলে ধরে নিন আপনার টাকা নিরাপদ নয়। এক্ষেত্রে জালিয়াতির অভিযোগে IDRA ও পুলিশে জানাতে পারেন।
সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের এজেন্ট প্রতারণা করলে কোম্পানি দায়ী হবে?
হ্যাঁ, এজেন্ট কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তাই এজেন্টের প্রতারণার জন্য কোম্পানি দায়ী। আপনি কোম্পানির বিরুদ্ধে IDRA ও ভোক্তা অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে পারেন। কোম্পানিকে গ্রাহকের ক্ষতি পূরণ করতে হবে।
আমি কি সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের পলিসি সারেন্ডার করে টাকা তুলতে পারব?
পলিসি সারেন্ডার করলে আপনি কিছু টাকা ফিরে পেতে পারেন, তবে তা সাধারণত জমানো প্রিমিয়ামের চেয়ে কম হয়। বর্তমানে সারেন্ডার ভ্যালু পেতেও দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। তাই সারেন্ডার করার আগে অফিস থেকে লিখিতভাবে জানিয়ে নিন কত টাকা পাবেন এবং কখন পাবেন। এক্ষেত্রে IDRA-র পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের বিরুদ্ধে মামলা করতে কী কী কাগজ লাগবে?
মূল পলিসি ডকুমেন্ট, প্রিমিয়ামের সব রশিদ বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, কোম্পানির সাথে যোগাযোগের প্রমাণ (ইমেইল, চিঠির কপি), পরিচয়পত্রের কপি এবং অভিযোগপত্র। সব কাগজপত্রের ফটোকপি সংরক্ষণ করুন। আদালতে মূল কাগজ জমা দিতে হবে।
IDRA-তে অভিযোগ করার সময়সীমা আছে কি?
সাধারণত কোনো সমস্যা হওয়ার ২-৩ মাসের মধ্যে IDRA-তে অভিযোগ করা ভালো। তবে পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার ১ বছর পরেও অভিযোগ করা যায়। যত বেশি দেরি হবে, প্রমাণ সংগ্রহ করা তত কঠিন হবে। তাই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ভবিষ্যতে কি সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স থেকে নতুন পলিসি নেওয়া উচিত?
বর্তমান অবস্থায় নতুন পলিসি নেওয়া থেকে বিরত থাকাই ভালো। কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা ও গ্রাহক সেবা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে আরও নির্ভরযোগ্য বীমা কোম্পানি রয়েছে, যেখানে ক্লেম সেটেলমেন্ট রেশিও ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বেশি। তাই নতুন বীমা নেওয়ার আগে ভালো রিসার্চ করে সিদ্ধান্ত নিন।
